খাদ্যাভ্যাস কি মানুষের বংশগতি বা জেনেটিক্স বদলে দিতে পারে? সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, উত্তরটি ইতিবাচক। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালা অঞ্চলের মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘকাল ধরে প্রধান খাবার হিসেবে আলু খাওয়ার ফলে তাদের জিনগত গঠনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আণবিক পর্যায়ে ‘AMY1’ নামক একটি জিন লালায় উপস্থিত ‘অ্যামাইলেজ’ (Amylase) এনজাইম বা উৎসেচক নিয়ন্ত্রণ করে। যখন কেউ শর্করা জাতীয় খাবার খায়, তখন এ এনজাইম মুখগহ্বরেই সেই শর্করা ভাঙতে শুরু করে। কোনো ব্যক্তির শরীরে এ জিনের সংখ্যা যত বেশি থাকে, তার শরীরে তত বেশি এনজাইম তৈরি হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, জিনের এ আধিক্য উচ্চ-শর্করাযুক্ত খাবার হজমে সহায়তা করে। এছাড়া অ্যামাইলেজ শরীরের মাইক্রোবায়োম (শরীরে থাকা অণুজীবের সমষ্টি) নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে, যা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। দুধে থাকা ল্যাকটোজ হজম করার ক্ষমতা অর্জন করাও এ ধরনের বিবর্তনীয় অভিযোজনের একটি বড় উদাহরণ।
নতুন এ গবেষণায় গবেষকরা আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার ৮৫টি জনগোষ্ঠীর ৩ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে পেরুর আন্দিজ অঞ্চলের আদিবাসী ‘কেচুয়া’ ভাষাভাষী ৮১ জন মানুষও ছিলেন।
গবেষকরা জানান, প্রাচীন আন্দিজের বাসিন্দাদের মধ্যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায় AMY1 জিনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট জেনেটিক বৈচিত্র্য তখনই ছড়িয়ে পড়ে, যখন সেটি বেঁচে থাকার জন্য কোনো বিশেষ সুবিধা দেয়।
ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলোর ডক্টরাল শিক্ষার্থী এবং গবেষণার সহ-প্রধান লেখক লুয়ান ল্যান্ডউ বলেন, ‘একটি হাইপোথিসিস বা ধারণা হলো—যাদের শরীরে AMY1 জিনের কপি বেশি ছিল, তারা আলুসহ অন্যান্য শর্করাযুক্ত খাবার সহজে হজম করতে পারতেন’।
ল্যান্ডউ আরও যোগ করেন, ‘বেশি জিনের কপি নিয়ে জন্মানো ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলেন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বেশি উত্তরসূরি রেখে গেছেন। এভাবেই সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান আন্দিজের মানুষের মধ্যে এ বিশেষ জেনেটিক বৈশিষ্ট্যটি সাধারণ হয়ে উঠেছে’।
আন্দিজের প্রতিকূল উচ্চতায় আলু ছিল একটি নির্ভরযোগ্য খাদ্য উৎস। গবেষণার আরেক সহ-প্রধান লেখক কেন্দ্রা শিয়ার বলেন, ‘প্রাচীন আন্দিজবাসীর খাদ্যাভ্যাসে ক্যালরির অন্যতম প্রধান উৎস ছিল আলু’।
ষোড়শ শতাব্দীতে স্প্যানিশরা ইনকা সাম্রাজ্য জয়ের পর আলু ইউরোপ ও বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষক বিহামের মতে, বিশ্বজুড়ে আলুর ব্যাপক জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করে যে এটি সবার কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য।
বর্তমানেও পেরুর পাহাড়ি বাজারগুলোতে কেচুয়া ভাষাভাষীরা বেগুনি, নীল, লাল, সোনালি, সাদা এমনকি কালো রঙের বৈচিত্র্যময় সব আলু বিক্রি করেন। গবেষক কেন্দ্রা শিয়ার জানান, পেরুতে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার প্রজাতির আলু পাওয়া যায়। অথচ বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ মাত্র কয়েক জাতের আলুর স্বাদ পান। অর্থাৎ, পৃথিবীতে এখনো এমন হাজারো জাতের আলু রয়েছে, যা দিয়ে বিচিত্র স্বাদের ‘ফ্রেঞ্চ ফ্রাই’ তৈরি করা সম্ভব!