Deri

বিনিয়োগ খরায় সংকটে অর্থনীতি, উত্তরণে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার

প্রকাশিতঃ মে ৮, ২০২৬ | ১২:৪২ অপরাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

দেশের অর্থনীতির ধমনিতে বিনিয়োগের যে প্রবাহ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই মরুভূমির ধূসর খরা। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় একটি রাজনৈতিক সরকার যখন হাল ধরল, তখনই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নতুন করে সংকটে ফেলেছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, এ অবস্থায় দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই রূঢ় বাস্তবতা আমাদের এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিনিয়োগের পথে পাহাড়সম বাধা হিসাবে জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার আর করের বোঝা তো আছেই; কিন্তু এর চেয়েও বড় ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতা। বিনিয়োগের পথে প্রধান অন্তরায় দুর্নীতি যে দানবীয় রূপ নিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। একজন উদ্যোক্তা যখন পুঁজি নিয়ে মাঠে নামেন, তখন তাকে পদে পদে যে অদৃশ্য বাধার দেওয়াল টপকাতে হয়, তা কেবল হতাশাজনকই নয়, আত্মঘাতীও বটে। সরকারি ফাইল বন্দি করে রাখা, স্বচ্ছতার অভাব এবং দায়িত্বশীল আচরণের চরম ঘাটতি বছরের পর বছর ধরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সরকারি দপ্তরের একশ্রেণির কর্মীর উদাসীনতা বিনিয়োগের পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টি আর দারিদ্র্য বিমোচনের একমাত্র পথ হলো বেসরকারি বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত করা। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসনকে আরও জনমুখী হওয়ার যে কড়া বার্তা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, প্রশাসনকে জনগণের সেবক হিসাবে কাজ করতে হবে এবং উন্নয়নের পথ সুগম করতে হবে। আমরাও মনে করি, সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণের পরিবর্তন এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটন ছাড়া বিনিয়োগের সুবাতাস বইবে না। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি; কারণ প্রশাসনের সদিচ্ছা ছাড়া কোনো সংস্কারই সফল হওয়া সম্ভব নয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। বিনিয়োগের এই মন্দা নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যে রূঢ় সত্যটি বলেছেন, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, বর্তমানে করের মাত্রা এবং ঋণের উচ্চ সুদ যে পর্যায়ে ঠেকেছে, তাতে কোনো উদ্যোক্তার পক্ষেই সৎভাবে ব্যবসা করে মুনাফা করা সম্ভব নয়; বরং লোকসানের ঘানি টানতে হবে। এই সংকট কাটাতে কেবল নীতিমালার খসড়া তৈরি করলে চলবে না, মাঠপর্যায়ে সেটির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসা এবং সরকারি ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতে মনোযোগ দেওয়া এখন অপরিহার্য। স্বীকার করতেই হবে, বৈশ্বিক যুদ্ধের অভিঘাত আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে ঘরের ভেতরের দুর্নীতি আর প্রশাসনিক স্থবিরতা দূর করা আমাদের সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসন যদি সত্যিই জনমুখী হয় এবং বিনিয়োগের পথে থাকা লালফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়, তবেই কেবল এই চোরাবালি থেকে অর্থনীতিকে টেনে তোলা সম্ভব। অন্যথায়, কর্মসংস্থানহীন এই প্রবৃদ্ধি দেশের ভবিষ্যৎকে আরও অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগ কেবল মুনাফার বিষয় নয়, এটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে আমলাতান্ত্রিক অবহেলায় বিসর্জন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।