সংসদীয় গণতন্ত্রের নবদিগন্ত


সংসদীয় গণতন্ত্রের নবদিগন্ত
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সুর ধ্বনিত হয়েছে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী এই সংসদ কেবল একটি আইনসভার আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছে জন-আকাঙ্ক্ষা ও নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। রোববার যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, এবারের ২৫ কার্যদিবসের অধিবেশনে কেবল কথার লড়াই বা বাগ্যুদ্ধ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের এক বিরল বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে। এবারের সংসদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো পালটাপালটি দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে গঠনমূলক বিরোধিতার সংস্কৃতির সূচনা করা। অতীতে আমরা দেখেছি সংসদীয় ব্যবস্থাকে একতরফা বা পাতানো কার্যক্রমে পর্যবসিত হতে, যেখানে বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করা হতো কিংবা বিরোধী দল কেবল বর্জনের সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করত। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদের চিত্র ছিল ভিন্ন। একদিকে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমানের ধৈর্যশীল ও সংযত আচরণ, অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সক্রিয় ও গঠনমূলক অংশগ্রহণ সংসদকে প্রাণবন্ত করেছে। বিশেষ করে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে যৌথ কমিটি গঠন করার যে নজির স্থাপিত হয়েছে, তা সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত নির্যাস। এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও জাতীয় সংকট নিরসনে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব।তবে এই ইতিবাচক অগ্রযাত্রার মাঝেও কিছু পুরোনো ন্যারেটিভ বা তিক্ততার ছায়া দেখা গেছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ বিতর্ক এবং ঐতিহাসিক কিছু স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে সংসদে যে সাময়িক অচলাবস্থা বা ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে, তা নির্দেশ করে যে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিয়ন্ত্রণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকা প্রশংসনীয়। স্পিকারের সতর্কবার্তা-সংসদ বিধি মোতাবেক না চললে থাকবে না, কথাটি কেবল সংসদ-সদস্যদের জন্য নয়, বরং পুরো জাতির জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।একটি কার্যকর সংসদের জন্য নবীন ও প্রবীণ সদস্যদের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। এবারের অধিবেশনে তরুণ নেতৃত্বের গঠনমূলক বক্তব্য এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের দিকনির্দেশনা সংসদের ভারসাম্য রক্ষা করেছে। সংসদ যে কেবল একটি টকিং ক্লাব নয়, বরং তা যে জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, তা প্রধানমন্ত্রীর সমাপনী বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। সংসদীয় চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা এবং একে ব্যর্থ হতে না দেওয়ার যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে দেশের জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা আরও সুসংহত হবে।এবারের সংসদ অধিবেশন আমাদের আশার আলো দেখিয়েছে। বিভাজন ও প্রতিহিংসার রাজনীতির বিপরীতে যে ঐক্যের বার্তা এই অধিবেশন ছড়িয়েছে, তা যেন কেবল একটি অধিবেশনেই সীমাবদ্ধ না থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক উঁচুতে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল যদি এই সহযোগিতার মনোভাব অব্যাহত রাখে, তবেই একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। এই সংসদ হোক প্রকৃত গণতন্ত্রের সূতিকাগার, এটাই প্রত্যাশা।